২০১০ সালে আমি বাতাকান্দি সরকার সাহেব আলি আবুল  হোসেন মেমোরিয়াল উচ্চ বিদ্যালয়ে সহকারি শিক্ষক (কৃষি শিক্ষা) যোগদান করি। আমার যোগদান সময়ে আবুল কাশেম মোল্লা শিক্ষক প্রতিনিধি ছিলেন। আমার যোগদান গ্রহণের রেজুল্যাশনে কাশেম মোল্লা স্যার স্বাক্ষর করেনি। সম্ভবত প্রধান শিক্ষকের সাথে উনার সম্পর্ক ভাল ছিল না। তবে আমার প্রতি উনার স্নেহের কমতি ছিল না। আমি প্রবাস ফেরত ছিলাম। চাকুরীর প্রথমদিকে খুব চঞ্চলতা ছিল। আমি কোন ভুল করলে আমাকে কাশেম মোল্লা স্যার গোপণে ডেকে নিয়ে ভুল ধরিয়ে দিতেন। আবুল কাশেম মোল্লা স্যার আমার শুধু সহকর্মী ছিলেন না, ছিলেন আমার শিক্ষকতার গুরু। আমার ভুল আমাকে কেউ কোন দিন বলেনি শুধু আবুল কাশেম মোল্লাই আমাকে ভুল সংশোধনের সুযোগ দিতেন। সেইদিক দিয়ে কাশেম মোল্লা স্যার আমার শিক্ষক।

আমার জানামতে বিদ্যালয়ের ছাত্র/ছাত্রী আবুল কাশেম মোল্লা স্যারকে ভয় পেতেন এবং শ্রদ্ধা করতেন। তিনি শিক্ষার্থীদেরকে অনেক স্নেহ করতেন। প্রতিটি শিক্ষার্থীকে নিজের সন্তানের মতই শাসন করতেন।

আমি গুরুত্ত্বের সহিত লক্ষ্য করতাম, উনি প্রায়ই বিদ্যালয়ে অবস্থান করতেন। আমি প্রথম দিকে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের কাজে সাহায্য করতাম একটু বেশি তাই বিদ্যালয়ে অবস্থান করতাম বেশি।  একদিন সাহস করে কাশেম মোল্লা স্যারকে জিজ্ঞাসা করলাম, স্যার আপনি স্কুল ছুটির পরে স্কুলে কেন? স্যার হাসিমাখা মুখে উত্তর দিতেন, স্কুল ছাড়া ভাল লাগে না। সময়মত মসজিদে নামাজ পড়তেন। আমাকেও বলতেন নিয়মিত নামাজ পড়ার কথা।

 

আবুল কাশেম মোল্লা স্যার স্কুলের হোস্টেলে থাকা অবস্থায় শিক্ষার্থী নিয়মিত নামাজ পড়তেন এবং কোন রকম নিয়ম কানুন ভঙ্গ করেনি। কোন শিক্ষার্থী বেয়াদবির সাহস করতেন না। আবুল কাশেম মোল্লা স্যারকে বিদ্যালয়ের সাবেক সভাপতি মরহুমা নাজমা বেগম এবং বর্তমান সভাপতি পারভেজ হোসেন সরকারুও খুব সম্মান করতেন। আমি শুনেছি, বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠতাও আবুল কাশেম মোল্লা স্যারকে সম্মান করতেন। আবুল কাশেম মোল্লা স্যারের সমকালীন সকল শিক্ষকই বাতাকান্দি সরকার সাহেব আলি আবুল হোসেন মেমোরিয়াল উচ্চ বিদ্যালয় থেকে অবসর নিয়েছেন। ফিরোজ খান নুন, মো. লিয়াকত আলি, আব্দুল খালেক মিয়াজি এবং আজিম উদ্দিন স্যার অবসরজনিত বিদায় নিয়েছেন। আবুল কাশেম মোল্লা স্যার অবজনিত বিদায় নিয়েছিলেন অনেক আগেই তবে উনার বিদায়টি স্বেচ্ছায় ছিল না। ব্রেইন-স্ট্রোক করে অসুস্থ্য হয়ে পড়েছিলেন তাই চাকুরীর পঁচিশ বছর বয়সে বিদ্যালয় থেকে বিদায় নিয়েছেন।

আবুল কাশেম মোল্লা স্যারের অসুস্থ কাহিনীটি আমার এখনো মনের চোখে ভাসে। বিদ্যালয়ে পরীক্ষা চলছিল। আমার আর আবুল কাশেম মোল্লা স্যারের ডিউটি ছিল দুতলায় পাশাপাশি কক্ষে। পরীক্ষার হলে শিক্ষার্থী আওয়াজ করছে কিন্তু আবুল কাশেম মোল্লা স্যার কিছুই বলছে না। বিষয়টি আমাকে ভাবিয়েছে। কারণ উনার ক্লাশে বা হলে বিরুক্তিকর আওয়াজ আসার কথা নয়। আমি নিশ্চিত ছিলাম স্যার অসুস্থ তাই শিক্ষার্থী সুযোগ পেয়েছে। আমি স্যারের পরীক্ষার হলে ডুকে শিক্ষার্থীদেরকে বললাম, স্যার সম্ভবত অসুস্থ তোমরা স্যারকে ডিস্ট্রাব করোনা। কোন প্রয়োজন হলে আমাকে বলিও আমি পাশের রোমে আছি। তারপর আবুল কাশেম মোল্লা স্যারকে বললাম, আপনি বাসায় চলে যান আমি আপনার কাজ চালিয়ে নিব। স্যার রাজী হলেন না। একটু পরেই পরীক্ষা হলে আমাদের বিদ্যালয়ের সেলিনা আপা আমাদেরকে চা দিলেন । সেলিনা আপা আমাকে বললেন, স্যার কাশেম স্যার কেমন জানি হয়ে গেছে। স্যারকে চা দিলাম, স্যার চায়ের কাপে আঙ্গুল না দিয়ে চায়ের মধ্যে আঙ্গুল দিয়েছে। কথাও কেমন জানি কয়। সেলিনা আপার এই কথা শুনে আমি আবার কাশেম মোল্লা স্যারের পরীক্ষা হলে ডুকলাম এবং স্যারের দিকে লক্ষ্য করলাম। হাতের কলমটাও ঠিকমত ধরতে পারছে না। কথার ভাব ভঙ্গী এলোমেলো মনে হয়। স্যারকে জিজ্ঞাসা করলাম, স্যার আপনি কি অসুস্থ? স্যার জবাব দিলেন, না। আমি বললাম, স্যার আপনাকে অসুস্থ্য মনে হচ্ছে আপনি বাসায় চলে যান। একটু রেস্ট নেন। স্যার বললেন, আমি অসুস্থ্য নই।

আমি পরীক্ষার হল থেকে নিচে নেমে আসলাম এবং আব্দুর রহিম ভাইকে বললাম, ভাই আবুল কাশেম মোল্লা স্যার সম্ভবত স্ট্রোক করেছে কিন্তু এতবড় কথা বলাও সম্ভবত নয়। উনাকে দ্রুত হাসপাতালে পাঠানো দরকার। আব্দুর রহিম ভাই আবুল কাশেম মোল্লার স্ত্রীকে ফোন করলেন এবং দ্রুত ডাক্তারের নিকট নিতে অনুরোধ করেছেন। তারপর আমি আর আব্দুর রহিম ভাই একটা রিক্সা ডেকে এনে আবুল কাশেম স্যারকে জোড় করে বাসায় পাঠালাম। কাশেম মোল্লা স্যার বাসায় গিয়ে নামাজ পড়লেন তারপরে কাশেম মোল্লা স্যারের স্ত্রীরি স্যারকে নিয়ে হাসপাতালে গেলেন। স্যার যেতে চায়নি। স্ত্রীরির অনুরোধ এবং আব্দুর রহিম ভাইয়ের অনুরোধে হাসপাতালে যেতে রাজী হলেন। হাসপাতালে যাবার পরপরি প্রথমিক ওষুধ দিয়ে ঢাকায় রেফার। ঢাকায় পরীক্ষা নিরীক্ষার পর জনালেন আবুল কাশেম মোল্লা স্যারের ব্রেইন স্ট্রোক হয়েছে। তারপরে একবছর অতিবাহিত হবার পর বিদ্যালয় থেকে অবসর নিলেন।

আবুল কাশেম মোল্লা স্যারের একটি ছেলে এবং একটি মেয়ে। ছেলেটি মোটর সাইকেল দূর্ঘটনায় মারা গেছেন। স্যারকে দেখা শোনা করতেন স্যারের মেয়ে। গতকাল ভোরে জাননাল বাতাকান্দি উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক আবুল কাশেম মোল্লা স্যার ইন্তেকাল করেছে। (ইন্না লিল্লাহে…রাজেওন)  গত ২০ মার্চ ২০২০ রাত অনুমান ২ঘটিকার সময় ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধিন অবস্থায় ইন্তেকাল করেছেন

 Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Advertisement Area

This is area for advertisement.

Subscribe

Get new posts by email:

রাঙ্গামাটির ঝুলন্ত ব্রিজ থেকে….

Site Statistics

  • Users online: 0 
  • Visitors today : 9
  • Page views today : 20
  • Total visitors : 5,010
  • Total page view: 7,976