ছোটবেলায় একটা গল্প শোনেছিলাম, নাছির উদ্দিন স্যারের ক্লাশে। (মজিদপুর উচ্চ বিদ্যালয় সহকারি শিক্ষক, বর্তমানে বাতাকান্দি সরকার সাহেব আলি আবুল হোসেন মেমোরিয়াল উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারি প্রধান শিক্ষক) ষষ্ঠ শ্রেণির ক্লাশ, ১৯৯১ সালের কথা।  স্যার আমাদেরকে প্রশ্ন করেছিলেন, বাংলাদেশে বর্তমানে ডাক্তার বেশি না রোগি বেশি। আমরা একযোগে উত্তর দিয়েছিলাম রোগি বেশি। স্যার বললেন না; ডাক্তার বেশি। আমরা তো অভাব হয়ে গেলাম। স্যার একটি বললেন। এক রাজ দরবারে ডাক্তার বেশি না রোগি বেশি এই নিয়ে রাজা উজিরের কথা কাটা কাটি। রাজা বলেন, আমার রাজ্যে ডাক্তার খুবই কম। রোগি খুব বেশি; তাই  রোগি সঠিকভাবে চিকিৎসা পাচ্ছে না। উজির বললেন, না মহাশয় ডাক্তার বেশি। রাজা খুব রাগ করে বললেন, উজির তুমি বড্ড বেশি বাড়াবাড়ি করছ। তুমি কি এর সঠিক প্রমাণ করতে পারবে যে ডাক্তার বেশি। উজির বললেন, “জি জাহাপনা; আমি প্রমাণ করতে পারব”।  রাজা বললেন, আগামী এ সপ্তাহের মধ্যে তুমি এর প্রমাণ না করতে পারলে তোমার গর্দান যাবে। উজির নির্ভয়ে উত্তর দিলেন, জাহাপনা এক সপ্তাহের মধ্যে আমি রোগি আর ডাক্তার-রোগির আদম শুমারি করে আপনাকে জানাব। উজির প্রমাণের জন্য সময় পেলেন একসপ্তাহের। কয়েকদিন পরেই রাজা উজিরকে আবার জিজ্ঞাসা করলেন, কি উজির সাহেব আপনার ডাক্তার শুমারির খবর কী? উজির বললেন, ডাক্তার-রোগির শুমারির কাজ চলছে।

ছয়দিন পর উজির সাহবে প্রচন্ড সর্দির জ্বর নিয়ে রাজ দরবারে হাজির হলেন। উজিরকে দেখেই রাজ দরবারের হেকিম বললেন, উজির সাহেব, আপনার তো সর্দির জ্বর মনে হচ্ছে; আপনি খাটি সরিষার তেল নাকে মুখে দিয়ে গোসল করে আসতেন তাহলে ভাল হয়ে যেত। ডাক্তার বললেন, নাপা আর হিস্টাসিন খেয়েছেন? সেনাপতি বললেন, কালোজিরা নিয়মিত খেতেন আপনার এই রোগ হতো না। রাজা বল্লেন,উজির সাহেব আপনি এই সর্দি নিয়ে রাজ দরবারে আসার কী দরকার ছিল? রাজ কবি বললেন, উজির সাহেব, ভাববেন না, রোগ আছে তো ওষুধ আছে; আপনি সকালে রসুন খেয়েছেন? রসুনে সর্দি আরোগ্য হয়। রানী বললেন, উজির সাহেব আপনি তুলসীপাতা খেয়েছেন? সর্দি কাঁশিতে তুলসী পাতা ভাল কাজ করে। রাজ দরবারের কবিরাজ বললেন, উজির সাহেব আমি আপনাকে এখনি মিক্সার বানিয়ে দিচ্ছি; কালকের মধ্যেই রোগ চলে যাবে। রাজ দরবারের আরো লোকজন আরো চিকিৎসা কথা শুরু  করলেন। উজির সাহেব বললেন, জাহাপনা; এই রাজ দরবারের রোগি কে? রাজা বললেন, আপনি উজির সাহেব। উজির প্রতিত্তোরে বললেন, জাহাপনা তাহলে রোগি কয়জন? রাজা বললেন, একজন। উজির বললেন, আমাকে প্রেসক্রিপশন দিলেন কয়জন? রাজা বললেন, আমি বুঁঝতে পারছি আপনার আদম শুমারি। রাজা বললেন, রাজ্যে এলহাম দিয়ে দিতে হবে ডাক্তার ছাড়া যেন কেউ প্রেসক্রিপশন না করে। সেনাপতি আপনি ব্যবস্থা করুন।

এই গল্পটি ইদানিং বেশি মনে পড়ে কারণ, করোনা ভাইরাস নিয়ে যে যা পারছে তাই ফেসবুকে লিখালেখি করছে। আমাকে তো ম্যাসেঞ্জারে করোনা ভাইরাসের নানান পরামর্শ দিচ্ছে। আমি তো ম্যাসেঞ্জারের আওয়াজে বিরুক্তি প্রকাশ করছি। বাংলাদেশে যত ফেসবুক ব্যবহারকারী আছে আমার মনে হয় ততজনই করোনা ভাইরাসের ডাক্তার। এই শোসাল মিডিয়ার ডাক্তারগণ ফেসবুকে আতঙ্ক না হবার জন্য আতঙ্কের তথ্য দিচ্ছে। ফেসবুকে ধার্মিকগণ করোনা ভাইরাসের দোয়া  প্রকাশ করছে। ভারতীয় কিছু ধর্মীয় নেতা গোমুত্রকে করোনার প্রতিষেধক বলে পাগল প্রলাপ বকছে। এই সুযোগে আমাদের ব্যবসায়ীগণ কাজে লাগিয়ে মাস্ক, চাল, পেয়াজের দামে আগুন লাগিয়ে দিচ্ছে।

সচেনতার প্রচারণা চলছে, প্রতিযোগিতার হারে। করোনা ভাইরাসের সচেনতার একটি পোস্টারে দেখলাম, বামপাশে উপরে জাতির জনকের  জন্ম শতবার্ষিকীর লোগো এবং তাঁর বামপাশে স্থানীয় এমপির ছবি, এর নিচে উপজেলা চেয়ারম্যানের ছবি, এর নিচে ইউনিয়েনসহ আরো ছবির সাথে করোনা ভাইরাসের সচেনতার শ্লোগান। ছবির পোস্টার দেখে বুঝা কঠিন যে, এটা কি ব্যক্তির প্রচারণা না সমাজে করোনা ভাইরাসের সচেনতার?

শোসাল মিডিয়া দেখলাম, করোনা ভাইরাসের আক্রান্তের সংখ্যা বড় বড় করে আপডেট দিচ্ছি আবার ভুল তথ্যও দিচ্ছে। কিছু আজগুবি কাহিনীও করোনা ভাইরাসের সচেনতার সাথে মিলিয়ে দিচ্ছে।

Comments are closed.