বড় হয়েছে গোমতির ঘোলা জল খেয়ে, ঘোলা জলে স্নান করে, নদীর স্রোতে যুদ্ধ করে নদীর এপার ওপার পাড়ি দিয়ে৷ শৈশব কাল শেষ হতে না হতেই গোমতি দুই বাড়ি গিলে ফেলা প্রত্যক্ষ করেছে।  নদীতে গোসল করতে গিয়ে কয়েকবার হাবুডুবু খেয়ে স্রোতে ভেসে যাচ্ছিলো, প্রত্যক্ষদর্শীদের উদ্ধারে প্রাণ বেঁচে যায় মো. মহসিনের। হাবুডুবু খেতে খেতে সাতার শিখেছে।  কুমিল্লা জেলার তিতাস উপজেলার সেই গোমতি নদীর পাড়েই মহসিনের জন্ম৷ গ্রামের নাম নারান্দিয়া৷

যে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাথমিক শিক্ষার সূচনা, সেটিতে ছিল না বেড়া খোরা৷ মসজিদের ঘাটে ও বারান্দায় ক্লাশ করাতেন শিক্ষকরা৷ তাদের অনেকেরই স্ল্যাট ও চক ছিল না৷ পন্ডিত স্যার তাদেরকে আইসক্রিমের কাঠি দিয়ে মাটিতে লেখতে দিতেন৷ পুরো গ্রাম কোনো ঘড়ি ছিল না, তাই কোনো দিন স্কুলে যেতেন সকাল ৮টায় কোনো দিন স্কুলে যাওয়ার পথেই ছুটির পর  ফেরত শিক্ষার্থীদের সাথেই ফেরত। আকাশ ভালো মন্দের ওপর তাদের  সময় নির্ভর করতো৷ মহসিনের  দাদা তিনটি গাভী পালতেন; তাই প্রতিদিন গরুর জন্য ঘাস কেঁটে আনা নদী বা বিলে মাছ ধরা বাধ্যতামুলক ও অভ্যাস ছিল৷

এভাবেই সম্পন্ন হয়েছে প্রাইমারী শিক্ষা৷ কখনো কখনো বাবার সাথে গরু লাঙ্গল দিয়ে চাষে সাহায্য করতে হতো৷

 

৬ষ্ঠ শ্রেণিতে থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত কখনো নতুন বইয়ের ঘ্রাণ নাকে যায়নি৷ বড় ভাই থেকে দুই বছরের পুরানো বই সংগ্রহ কখনো পুরানো বই কিনেই পড়তে হয়েছিল৷ ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে শুরু হয়েছিল গ্রামার পড়া৷ বই না থাকায় ইংরেজি শিক্ষকের গ্রামার পড়া না শেখার কারণে স্কুলে যায়নি কয়েকদিন৷ এক বন্ধুর পিতা পুলিশে টাকরি করেন৷ সে একটি ছোট্ট গ্রামার বই তার কাছে বিক্রি করেছিল আট টাকায়৷ মহসিন তার টাকাটা চার কিস্তিতে পরিশোধ করেছিল৷ মহসিনের সহপাঠীরা লুঙ্গি পড়ে স্কুলে যেতো।  পায়ে জুতাও থাকতো না৷ অষ্টম শ্রেণিতে উঠে প্যান্ট পড়ার যাত্রা৷ গ্রাম থেকে স্কুলে যাবার কোনো রাস্তা ছিল না৷ বর্ষাকালে তারা ছয়জন মিলে ৬০০ টাকায় একটা নৌকা কিনেছিল। নিজেরাই বেয়ে নৌকা দিয়ে স্কুলে যেত। প্রতি সপ্তাহে একবার আসার পথে নৌকা ডুবিয়ে দিয়ে মজা করত৷ দু’একটি মেয়েও মাঝে মাঝে তাদের সাথে নৌকা দিয়ে স্কুল থেকে ফিরতো৷ বাবা কৃষক৷ মহসিনরা ছয় ভাই৷ সবাই পড়াশোনা করতো৷ সংসার চলতো সম্পূর্ণ কৃষির ওপর ভিত্তি করে৷ তাই সকলেই পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে কৃষি কাজ করত৷ মাঘ মাসে ইরি (আইআরআরআই) রোপনের ও সরিষা ঘরে তোলার সময় ছিল৷ এ সময় তারা প্রায়ই স্কুলে যেতাম না৷ তাদের ছয় বন্ধুর একটা দল ছিল৷ সবাই একই গ্রামের৷ ইরি রোপনের সময় ছয়জন মিলে চুক্তি করে অন্যের জমিতে ইরির চারা রোপন করত৷ সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ছয় জনে ৯০-১০০ শতাংশ জমিতে ইরির চারা রোপন করে, জন প্রতি ৫০-৬০টাকা করে পেত৷ সেগুলো থেকে কিছু বাবাকে দিত বাকিগুলো দিয়ে শিক্ষা উপকরণ কিনত ও স্কুলের বেতন  দিত৷ আবার ধান কাটার মৌসুমে মানে বৈশাখ মাসে প্রায়ই স্কুলে যেত না৷ নিজেদের জমির ধান কাটত৷ পাঁচ-ছয়জন মিলে চুক্তিতে অন্যের জমির ধান কেটেও টাকা আয় করত৷ তাদের জমি ছিল বাড়ি থেকে প্রায় এক-দেড় কিলোমিটার দূরে৷ কিন্তু তারা মাথায় ধানের বোঝা বহন করে বাড়িতে আনত৷ রৌদ্রে প্রচন্ড তাপে রাস্তা উত্তপ্ত থাকতো৷ রোদ্রের তাপের সময় খালের পাড়ের রাস্তা দিয়ে ধানের বোঝা আনতে গিয়ে একদিন পায়ের তলায় ঠসা পরে গিয়েছিল, তবুও সারা দিন বোঝা বহন করা বন্ধ করে নাই৷ বিকেলে পা আর মাটিতে ছুতে পারে নাই বিধায় সেন্ডেল পায়ে দিয়ে বোঝা এনেছিল৷

ধান রোপনের পর জমিতে ঘনঘন সেচের পানি দিতে হতো৷ দিনে বিদ্যুৎ থাকতো না৷ তাই মটরের মালিক রাত্রে মটর চালাতেন৷ সকলেই পানির জন্য তার কাছে ধর্ণা ধরতো এবং তোষামোদি করতো৷ মহসিন রাত দশটা পর্যন্ত পড়ত কেরোসিন চালিত হারিকেন দিয়ে৷ পড়ে শেষে সে হারিকেনটি নিয়ে একাকি জমিতে চলে যেত৷ প্রায় সাড়ে দশটা কিংবা এগারোটা বাজলে বিলে তেমন মানুষ থাকতো না৷ মটরের মালিকও আর বের হতেন না৷ এ সুযোগে মহসিন ড্রেনের লাইন পরিবর্তন করে তাদের জমিতে পানি দিয়ে চলে আসত৷ এ জন্য দাদা মহসিনকে দেখলে পানি চোর বলতেন৷

 

 

প্রাইভেট পড়ার কথা পিতাকে বলতে কখনো সাহস করেনি৷ এক বন্ধুর কাছ থেকে একটা গণিতে নোট এনে সবগুলো অংক নোট দেখে দেখে খাতায় নোট করে নিজে নিজেই অংক শিখেছিল৷ তার শিক্ষা জীবনে একমাস ইংরেজি ও দুই মাস গণিত প্রাইভেট পড়েছিল৷ পুরো একমাস ইংরেজি পড়া শেষ করতে পারেনি৷  জমির ধান পেকেছিল তাই ধান কাটার জন্য ২০দিন পড়ার পর আর যেতে পারেনি৷ অষ্টম শ্রেণিতে রোল নং ০৪ ছিল৷ নবম শ্রেণিতে উঠে কোনো বিভাগে পড়বে সে পরামর্শ কেউ দেয়নি তাই বিজ্ঞানে ভর্তি হয়নি৷ অথচ তার মামা দুইজন প্রকৌশলী৷ তাঁরা কোনো দিন মহসিনদের পড়াশোনার খবর নেননি, পরামর্শ দেয়া থাক দূরের কথা৷ তারা মনে করতেন বড় হয়ে হয়ত জেলে না হয় চাষা হবো! দশম শ্রেণির কাজ কমিয়ে পড়াশোনায় বেশি মনোযোগী হয়েছিল৷ কিন্তু বর্ষাকালে প্রতি শুক্রবার রাত ১০টা পর্যন্ত পড়ে জেলেদের সাথে সারা রাত্র মাছ ধরতে যেত৷ নৌকায় থাকলে একভাগ আর পানিতে নামলে দেড়ভাগ টাকা পাওয়া যায়৷ তাই সারা রাত পানিতেই নেমে থাকত৷ সকাল ৮টা পর্যন্ত মাছ ধরে অন্যরা ২৮-৩০টাকা ভাগে পেতেন মহসিন ৪০-৪৫ টাকা পেতাম৷ আর শুকনো মৌসুমি জমির সকল কাজ জমা থাকতো শুক্রবারের আশায়৷

কলেজে ভর্তি হয়ে একটা সাইকেল কিনার প্রয়োজন হলো৷ পনেরো দিন চুক্তি ধান কেটে ৭শত টাকা দিয়ে একটা পুরানো সাইকেল কিনেছিল৷ কলেজে যেতে সেটা চালিয়ে তিন কিলোমিটার যেয়ে গাড়িতে উঠত৷ কম্পিউটার শেখার সখ হয়েছিল৷ এলাকায় কোনো কম্পিউটার ছিল না৷ রায়পুর শুধু একটা দোকান ছিল৷ সেটাতে শেখানো হতো৷ এমএস ওয়ার্ড, এক্সেল, এক্সেস, পাওয়ারপয়েন্ট উইন্ডোজ সেট-আপ শেখার চুক্তিতে তিন হাজার টাকা দিয়ে ভর্তি হয়েছিল৷ ওস্তাদ বয়সে ছোট ছিল তাই খুব যত্ন করে শেখাতেন৷ তিন মাস চুক্তি করেছিল কিন্তু ওস্তাত তাকে ছয় মাস পর্যন্ত রেখেছিলেন৷

কাউকে কিছু বুঝাতে ও শেখাতে খুব আনন্দ লাগতো৷ শিক্ষকতাকে স্বপ্নে ধারন করে বাস্তবে রূপ দিলেও এটি দিয়েছে তিক্ত যন্ত্রণা৷ চার বছর এমপিও ব্যতীত বিনা পয়সায় চাকরিসহ গরিবের কষ্টের টাকা স্কুল কোষাগারে জমা না হয় প্রধানের যোগসাজে কতিপয় অর্ধ-শিক্ষিত ও অশিক্ষিত  লোকের পকেট ফুলানোর অভিজ্ঞতা৷ প্রতিবাদ করলে তার মতো শিক্ষকের ঠাই ক্লাশ রুমে ঠাই না হয়ে পথে পথে হাঁটতে ঘুরতে হয়েছিল৷

যাই হোক, ২০০৯ সালে এক ছাত্র জানালো তার পিতা সিঙ্গাপুর থেকে কম্পিউটার এনেছেন৷ মহসিন স্কুলের হোস্টেলে থাকতাম৷ সে-ও থাকতো৷ মহসিন  তাকে ফুসলিয়ে তার কম্পিউটারটি স্কুলে হোস্টেলে নিয়ে আসল৷ ল্যাংগুইজের ক’টি ইংরেজি বইয়ের সাথে সিডি পেয়েছিল৷ সেগুলো দিয়ে সে বছর প্রথম কম্পিউটারের মনিটর ব্যবহারের মাধ্যমে ক্লাশ নিয়েছিলাম এবং হোস্টেলের ছাত্রদেরকে একসাথে করে ক্লাশ নিয়েছিল৷ ইতালি প্রবাসির এক ছেলেকে তার বাড়িতে গিয়ে প্রাইভেট পড়াত৷ তাকে বুঝিয়ে তার বাবাকে দিয়ে একটি ল্যাপটপ আনিয়েছিল৷ তাকে কিছু শেখাত বাকিটা মহসিন ব্যাবহার করত৷ এডভ্যান্স আইসিটি প্রশিক্ষণ পাবার সুযোগ পেয়ে কতিপয় আইসিটি প্রেমিক শিক্ষকের সাথে পরিচয় হয়েছিল৷ দীর্ঘদিন প্রশিক্ষণ পাওয়ায় আইসিটির প্রতি ঝোক অনেকটা বেড়ে গিয়েছিল৷ অত:পর স্কুলের সভাপতিকে বুঝিয়ে স্কুলে একটি ডেস্কটপ কিনেছিল, পরবর্তিতে স্কুলে প্রজেক্টর, স্মার্ট টিভি মিলিয়ে ছয়টি ডিজিটাল ক্লাশরোম হয়েছিল৷ বাতায়ন থেকে কনটেন্ট দিয়ে ক্লাশ নিতে গিয়ে ধারাবাহিকতা ঠিক রাখতে পারত না৷ ভেবেছিল নিজেই কনটেন্ট বানিয়ে ক্লাশ নিলে মনপুত ক্লাশ নেয়া যাবে৷ তাই কনটেন্ট বানিয়ে বাতায়নে আপলোড দেয়া শুরু করলাম৷ তখন মহসিন চান্দিনায় শিক্ষকতা করি৷ বাতায়নের গুরুরা যেভাবে পরামর্শ সেভাবেই বাতায়নে লেগে থাকতাম৷ সেরার হওয়ার স্বপ্নটা নিয়ে নির্ঘুম রাত কাটাতে হয়েছি অনেকদিন৷ ছয় মাস চেষ্টার পর চুয়াডাঙ্গার নুর কুতুবুল আলম ও সুনামগঞ্জের আব্দুস সামাদ স্যারের সহায়তায় সাপ্তাহিক সেরার স্বপ্নটা বাস্তবায়ন হয়েছিল৷ দীর্ঘদিন পরিশ্রমের সফলতা মহসিন তার প্রধানকে জানালে তিনি একটুও খুশি হননি, ধন্যবাদ থাক দূরের কথা৷ অথচ আন্ত:স্কুল রচনা প্রতিযোগিতার সফলতার অভিনন্দনও সমাবেশের মাইকে ঘোষনা করে দেয়া হতো৷

 

ব্রিটিশ কাউন্সিল কর্তৃক আইএসএ এ্যাওয়ার্ডের জন্য বিদেশী স্কুলে শিক্ষকদের সাথে কানেন্টিং ক্লাশরোমের ওপর কাজ করে সফল হয়েছিল৷ এতে শিক্ষার্থীরা খুবই আনন্দ পেতো৷ বিদেশী শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সাথে ক্লাশে আলাপচারিতার সময় তাদেরকে ভালো বক্তা ও ইংরেজিতে দক্ষ মনে হতো৷ বিদেশীদের বিভিন্ন কৃষ্টি কালচার, শিক্ষা ও বিজ্ঞান চর্চা দেখে শিক্ষার্থীরা খুবই আনন্দ পেতো৷ তবে এ কাজ করেছিল শিক্ষার্থীদেরকে নিয়ে স্কুল ছুটির পর কিংবা বন্ধের দিনে৷ কারণ মহসিনের ডিজিটাল কর্মের পেছনে সর্বদাই নিন্দুক লেগে থাকতো৷ আন্তর্জাতিক মানের এই এ্যাওয়ার্ডের ব্যাপারে প্রতিষ্ঠান প্রধানের অবদানের কথা উল্লেখ করে মহসিনের প্রোফাইলে পোস্ট দিলে প্রধান খুব রাগ করে বকাঝকা দিয়েছিলেন৷ কারণ এগুলো নাকি মহসিন ব্যক্তিগত সফলতা ও অর্জন! এতে প্রধান শিক্ষকের নাম উল্লেখ করা যায় না৷ এত বাধা ও প্রতিকূলতার পরও থেমে থাকেনি৷

 

বাতায়ন কর্তৃক অ্যাম্বাসেডর পদ পেয়ে চান্দিনা উপজেলায় ৩-৪টি স্কুলে শিক্ষক একসাথে জড়ো করে বৃহস্পতিবার বিকেল বেলায় কামরুল কবির স্যার ও রাহাতুজ্জামান পাটোয়ারীরসহ তাদের শিক্ষকদেরকে মুক্তপাঠ, কনটেন্ট ও মাল্টিমিডিয়া ক্লাশরোম সম্পর্কে চান্দিনা উপজেলা ১০টি ইনহাউজ প্রশিক্ষণ দিয়েছিল৷ এতে আইসিটি আগ্রহী শিক্ষকরা নিজ খরচেই বিভিন্ন স্কুলে গিয়ে কাজ করেছিল৷ শতশত শিক্ষককে বাতায়নের সদস্যকরণ, মুক্তপাঠের সদস্য করে কোর্স করতে উদ্ভোদ্ধ করত: মাল্টিমিডিয়ার সাহায্যে ডেমো ক্লাশ উপহার দিয়েছিল আইসিটি আগ্রহী শিক্ষকরা৷ যখন যে শিক্ষকই ডাকতেন স্বপ্রণোদিত হয়ে ছুটে গিয়েছিল এবং ডিজিটাল শিক্ষক ও ডিজিটাল ক্লাশরোম সম্পর্কে সহায়তা করেছিল৷ এ ব্যাপারে দাউদকান্দির একটি ডিগ্রি কলেজের ও দুইটি উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষকদেরকে বেশ সময় দিয়েছিল৷

এখন বর্তমান কর্মস্থল খেড়িহর আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ে (খেড়িহর আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ে সহকারি প্রধান শিক্ষক) শিক্ষকদেরকে নিয়ে প্রতিমাসেই ইনহাউজ প্রশিক্ষণ করে থাকে৷ তাদের শিক্ষকেরা মোটামুটি ভালো দক্ষ হয়ে উঠেছেন৷

বাতায়নে শুরু হলো উদ্ভাবনের গল্প আপলোডের প্রতিযোগিতা৷ ভিডিও এডিটিংয়ের ওপর কোনো প্রশিক্ষণ নাই৷ ইউটিউবের টিউটরিয়াল ও নিজস্ব চেষ্টায় বেশি ভালো না পারলেও সফল হয়েছিল বটে৷

 

 

সর্বদাই শিক্ষাদানে নতুন নতুন চিন্তা মাথায় আসতো৷ কিন্তু বাস্তবায়নে বড় বাধা হতো সহকর্মী৷ চান্দিনার বড় গোবিন্দপুর স্কুলের সহকারী শিক্ষক থাকা অবস্থায় চুরি করে করে উদ্ভাবনের ভিডিও তৈরি করতে হতো এবং গোপনে শিক্ষার্থীদেরকে দেখাতে হতো৷ কারণ প্রধান এ ব্যাপারে মোটেও পাত্তা দিতেন না৷ একজন সহকর্মির সহায়তায় তাকে সর্বদাই আইসিটি ব্যাপারে চাপে রাখা হতো৷ এমনকি স্কুলের কম্পিউটার না ধরার জন্য তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিলেন প্রতিষ্ঠান প্রধান৷  স্পোকেন ইংলিশ সম্পর্কে ভিডিও তৈরি করেছিল অনেক ভয়ে ভয়ে, যদি প্রধান দেখেন বা শোনেন কি যেন হয়! সে ভিডিওটি বাতায়নের গ্রুপ পেইজে আপলোড দিয়েছিল৷ জনাব রফিকুল ইসলাম সুজন স্যারসহ অনেক জ্ঞানীগুণী শিক্ষকেরা প্রশংসা করে মন্তব্য করেছিলেন, তবে তার ঐ এক সহকর্মী দেখে ফেলে কিনা সে ভয়ে নিজস্ব প্রোফাইলে আপলোড দেবার সাহস পায় নাই৷

 

একদিন প্রধান শিক্ষক তাঁর কক্ষে ডেকে নিয়ে শাসিয়েছিলেন যে আমি যেন কোনোদিন স্কুলের কম্পিউটারের সামনে না বসি৷ ক্লাশে নতুন কিছু করলে সহকর্মী প্রধানকে উলটপালট বুঝিয়ে আমার বারোটা বাজিয়ে দিতেন৷

 

 

খেড়িহর আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ে সহকারী প্রধান হওয়ার পর সে সমস্যা দূর হলো৷ শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাবটি পরিচালনার জন্য তার নামে রেজুলেশন করে দেয়া হলো৷ বন্ধের দিনসহ সর্বদাই সে শিক্ষার্থীদেরকে ল্যাবে নিয়ে লেপটপ ব্যাবহার করাচ্ছে৷ এখানে প্রধান কর্তৃক স্বাধীনতা পেয়ে উদ্ভাবনের গল্প ভিডিও বানিয়ে দুই-তিন সপ্তাহ আপলোড করার পরই সফলতার আলো দেখল৷ শিক্ষার্থীদেরকে শিক্ষার ব্যাপারে নতুন কিছু করতে চাইলে সবাই আগ্রহের সহিত সাড়া দেয়৷ দেখলাম আইটি ভিত্তিক শিক্ষাটা তারা বেশ ভালোভাবে গ্রহণ করে৷ এখানে বাস্তবভিত্তিক জ্ঞানার্জনে গুরুত্ব দিতে সে একাধিক ক্লাশ গাছের বাগানও খোলা জমিতেও নিয়েছে৷ শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা ও মূল্যবোধ উন্নয়নে দুইটি চার পর্বের ডকুমেন্টারী, মিড-ডে  মিলের প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্বের ওপর গুরুত্ব দিয়ে একটি,  সলিউশন থ্যো কমিউনিটি ব্যাপারে একটি,  আইসিটি  ভিত্তিক  শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালার ওপর  মহসিনের একাধিক ডকুমেন্টারী রয়েছে  বাতায়নে৷ শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব ব্যবহার করার জন্য  শিক্ষার্থীদেরকে  আর ডাকতে হয় না৷ প্রতিদিন সকাল ৮টায় শিক্ষার্থীদের গ্রুপ ল্যাবের চাবির জন্য ভীড় জমায়৷ তবে মহসিন আর তাদের সাথে বেশিক্ষণ  থাকতে হয় না; এখন সিনিয়র  শিক্ষারর্থীরা জুনিয়রদেরকে শেখায়৷

 

 

 

2 Comments

Shahzaman ShuvohMarch 3, 2020 at 2:32 pm

জীবন সংগ্রামে লেখাপড়া থেকে শুরু করে পেশাজীবনে এসে যে সফলতা স্যার পেয়েছে এর জন্য স্যারকে অভিনন্দন, আশা করি ভবিষৎতে সৃজনশীল কর্মকান্ডের মাধ্যমে নিজকে আরো ফুটিয়ে তুলবে।

Shahzaman ShuvohMarch 3, 2020 at 2:32 pm

Thank you very much.

 Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Advertisement Area

This is area for advertisement.

Subscribe

Get new posts by email:

রাঙ্গামাটির ঝুলন্ত ব্রিজ থেকে….

Site Statistics

  • Users online: 0 
  • Visitors today : 8
  • Page views today : 16
  • Total visitors : 5,009
  • Total page view: 7,972