এলিয়েন যদি আমাদের বাড়ি কোথায় জানতে চায় তাহলে এর উত্তর কী হবে? গ্রাম, জেলা, বিভাগ নাকি দেশের নাম । এলিয়েন কিন্তু এসবের কিছুই চেনে না। সে শুধু পৃথিবী নামের একটি গ্রহ চেনে। তখন এলিয়েনের সাথে আমাদের কথা হবে এই পৃথিবীর প্রতিনিধি হিসেবে। সুতরাং আমাদেরকে বৈশি^ক মানের হয়ে বেড়ে উঠতে হবে যেন পৃথিবীর নেতৃত্ব দেয়া যায়। একটি গ্রহের প্রতিনিধি হয়ে  প্রতিযোগিতা করা যায় আরেকটি গ্রহের সাথে। এমন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন একজন মানুষ লালমনিরহাট জেলার কালীগঞ্জ করিম উদ্দনি পাবলিক পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক খুরশীদুজ্জামান আহমেদ।

প্রতিনিয়ত স্বপ্নের বীজ রোপন করেন, দেখিয়ে যান স্বপ্ন সত্যের পথ। আদিম গুহায় আটকে পড়া , পথহারা অসংখ্য জীবনের জন্য আলো জ¦ালেন কখনো জ্ঞান দানে আবার কখনো সাহস দিয়ে। কখনো শিক্ষক, কখনো পিতা অথবা বন্ধু হয়ে। অথচ তাঁর নিজের জীবনটাই একসময় হারিয়ে গিয়েছিল অন্ধকার গলিতে। তাঁর বন্ধুরা যখন নিজের সংসার আর চাকরি নিয়ে ব্যস্ত তখন তিনি কর্মহীন। বাউন্ডলের মত পাড়ায় গানবাজনা করে কাটে সময় । উদ্দেশ্যহীন, কর্মহীন এক নাটকীয় বেকার জীবন। ধীরে ধীরে শুধু ক্ষয়ে যাওয়া, অশুভ ভাঙনের শব্দ চারিদিকে । শুধইু পতন, কোনো উত্থান নেই । তাঁর এই ক্ষয়ে যাওয়া সময়ে বাতিঘর হয়ে এলেন শিক্ষাগুরু বাবু মহেন্দ্রনাথ রায়। একরকম ধরে নিয়ে এসে বাবার প্রতিষ্ঠিত কালীগঞ্জ করিম উদ্দিন পাবলিক পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের ক্লাস রুমে ঢুকিয়ে দিলেন। ক্লাস নেয়া শুরু করলেন স্বেচ্ছাসেবী শিক্ষক হিসেবে। খুব আল্পদিনের মাঝে শিক্ষার্থীদেরকে ঘিরে মনের ভিতর স্বপ্ন উকি দেয়া শুরু হল। একটা নেশা চেপে বসল আশেপাশের প্রতিষ্ঠানগুলোর চেয়ে ভালো ফল করার। অন্যান্য শিক্ষকদের সাথে নিয়ে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে শুরু হল একটা যুদ্ধ। এসএসসি পরীক্ষার ফল আগের তুলনায় আশ্চর্যরকমভাবে ভালো হওয়ার পাশাপাশি অষ্টম শ্রেণীর বৃত্তি পরীক্ষায় বৃত্তি পাওয়া শুরু হল। এই যুদ্ধে সফল হলেন তিনি। শিক্ষকতা তাঁর স্বপ্নে রুপান্তরিত হলো। মনে হল আর এই জায়গা ছেড়ে কোথাও যাবেন না। কিন্তু ইচ্ছের পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় শিক্ষাগত যোগ্যতা। তিনি তো কেবল ইন্টারমেডিয়েট পাশ। এই যোগ্যতা দিয়ে কোনোভাবেই স্থায়ী শিক্ষকের পদ পাওয়া সম্ভব না। দমে যাবার মানুষ নন তিনি। শুরু হলো জীবনের আরেক নতুন যুদ্ধ। আবার ছাত্র জীবনের শুরু। মাস্টার্স শেষ করলেন। সহকারী শিক্ষকের  চাকরি পেয়ে এখন প্রধান শিক্ষক।

শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলে জানা যায় তিনি প্রজ্ঞাবান, পরিশ্রমী , সৃজনশীল ও দক্ষ নেতৃত্বের এক অনন্য উদাহারণ। দুর্বল ও মানসিকভাবে ভেঙে পড়া শিক্ষার্থীদের পরম মমতায় এগিয়ে দেন  সামনে। সাহায্য করেন রাস্তা খুঁজে পেতে। দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থী আবু সাকিব চৌধুরী  বলেন, ‘স্যার আমাদের শিক্ষকক ও অভিবাবক। তাঁর নতুন নতুন চিন্তার বাস্তবায়ন এবং স্কুলের শিক্ষার্থীদেরকে জাতীয় ও আন্তর্জাতকি পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের সুযোগ প্রদান অবশ্যই দক্ষ মানবসম্পদ তৈরীতে ভ‚মিকা রাখবে।’

প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব নেয়ার পর জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহে লালমনিরহাট জেলায় বেশ কয়েকবার শ্রেষ্ঠ বিদ্যালয়ের পদক পেয়েছে করিম ্উদ্দিন পাবলিক পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়। ঈর্ষনীয় সাফল্য এসেছে একাডেমিক ফলাফলে। পাশাপাশি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় শ্রেষ্ঠত্বের স্বাক্ষর রেখেছে এই বিদ্যালয়। ২০১০ ও ২০১৩ সালে ব্র্যাক-এটিএন বাংলা ও ডিবেট ফর ডেমোক্রেসির আয়োজনে জাতীয় স্কুল বিতর্ক প্রতিযোগিতা ‘বিতর্ক বিকাশ’- এ জাতীয় পর্যায়ে দুই বার চ্যাম্পিয়ন হয়। ইসলামিক ফাউন্ডেশন আয়োজিত জাতীয় একক বক্তৃতা প্রতিযোগিতায় ২০১২ সালে চ্যাম্পিয়ন হয় মো. শাহনেওয়াজ স¤্রাট। ২০১৪ সালে প্রথম আলো ও পেপসোডেন্ট আয়োজিত জাতীয় স্কুল বিতর্ক প্রতিযোগিতায় কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত যাওয়ার গৌরব অর্জন করে। এই প্রতিযোগিতার বারোয়ারি বিতর্ক বিভাগে দেশ সেরা হয়  জান্নাতুন নাঈম সোমা

বাংলাদেশ শিশু একাডেমি আয়োজিত একক  বক্তৃতায় ২০১৫ সালে স্বর্ণপদক অর্জন করে আমীর সোহেল রাব্বী এবং ধারাবাহিক গল্প বলায় ২০১৭ সালে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ-এর হাত থেকে স্বর্ণপদক গ্রহণ করেন হাবিবা সুলতানা বন্যা। বিএফএফ-সমকাল জাতীয় স্কুল বিজ্ঞান বিতর্ক প্রতিযোগিতায় জাতীয় পর্যায়ে রানার আপ হয় ২০১৭ সালে।

দেশের গÐি পেরিয়ে বিদেশের মাটিতেও সাফল্যের স্বাক্ষর রেখেছে স্কুলটি। ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তায় অনুষ্ঠিত এশিয়ান ইংলিশ অলিম্পিক ২০১৭- এ অংশগ্রহণ করে দুই শিক্ষার্থী উম্মে হাবিবা লিমা ও আফিয়া জাহিন রোদসি। পাবলিক স্পিকিং-এ আক্টো ফাইনালিস্ট হওয়ার গৌরব অর্জন করে প্রতিযোগিতার সর্ব কণিষ্ঠ প্রতিযোগী উম্মে হাবিবা লিমা। সম্মানজনক আন্তর্জাতিক কমনওয়েলথ রচনা প্রতিযোগিতায় ২০১৬ থেকে এই পর্যন্ত মোট ১৬ জন শিক্ষার্থী সনদ পেয়েছে। বিজ্ঞান মেলার উদ্ভাবনী প্রতিযোগিতা, সাঁতার, ফুটবল, ক্রিকেটসহ প্রায় সবধরণের জাতীয় প্রতিযেগিতায় অংশগ্রহণ করে তাঁর স্কুল। স্কুলে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের নিয়ে প্রায়ই আয়োজন করেন বিভিন্ন সেমিনার ও কর্মশালা।

ইতিবাচক মানসিকতা লালন করেন বলেই নিজের দৃষ্টিসীমাকে বহদূর নিয়ে যেতে পেরেছেন উল্লেখ করে কালীগঞ্জ উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার আফরোজা বেগম বলেন,‘সৃজনশীলতার চর্চা শিক্ষাথীদের পড়ালেখায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে না বরং এই শিক্ষার্থীদের হোচট খাওয়ার সভ¦াবনা কম। খুরশীদুজ্জামান আহমেদ তাঁর স্কুলকে রংপুর অঞ্চলের সৃজনশীল কাজের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করে একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।’

শিক্ষাক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন প্রতিনিধি হিসেবে স্কুল ম্যানেজমেন্ট বিষয়ের উপর কানাডার কুইন্স ইউনিভার্সিটিতে প্রশিক্ষণের সুযোগ পান ২০১৬ সালে। দক্ষিণ কোরিয়ার সিউলে অনুষ্ঠিত ই-লার্নিং শীর্ষক সেমিনারে ২০১৩ সালে অংশগ্রহণ করেন বৃটিশ কাউন্সিলের সহযোগিতায়। ২০১৫ সালে বৃটিশ কাউন্সিলের কানেকটিং ক্লাসরুমের আওতায় পরিদর্শন করেন লন্ডনের স্যার জন ক্যাশ রেড কোট সেকেন্ডারী স্কুল ।

স্কুলের ইংরেজী বিভাগের সহকারী শিক্ষক বদলুল আলম মনে করেন  তাঁর মত যদি সব শিক্ষক কাজ করেন তাহলে দেশটা উন্নত বিশে^র কাতারে যেতে খুব বেশিদিন লাগবেনা।

প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংগঠনের। তিনি বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি লালমনিরহাট জেলার সভাপতি, জিস্ট ইন্টারন্যাশনাল ফাউন্ডেশনের রংপুর রিজিওনাল ডিরেক্টর, বৃটিশ কাউন্সিলের স্কুল এ্যাম্বাসেডর এবং এ টু আই আইসিটি ফর এডুকেশনের এ্যাম্বাসেডর। তাঁর মতে শুধু শিক্ষার্থীদেরকে দক্ষ করে গড়ে তুললে হবেনা শিক্ষকদেরও দক্ষতা বাড়াতে হবে। এই চিন্তা থেকে রংপুর বিভাগের শিক্ষকদের নিয়ে  চালু করেছেন অনলাইন ভিত্তিক সংগঠন প্রতিশ্রæতিশীল শিক্ষক সমাজ। নিজ উপজেলা কালীগঞ্জকে সারাদেশে একটি বিশেষ নাম শিক্ষাঞ্চল কালীগঞ্জ হিসেবে পরিচিত করতে চান।  শিক্ষার মডেল হিসেবে গড়ে তুলতে উপজেলার ১২ টি স্কুল নিয়ে তাঁর নেতৃত্বে কাজ করছে  টুয়েলভ স্টার স্কুল -শিক্ষাঞ্চল কালীগঞ্জ।

 

একজন আধুনিক, প্রগতিশীল ও সুরুচিসম্পন্ন মানুষ উল্লেখ করে পিএসসির সদস্য ও ন্যাশনাল একাডেমি ফর এডুকেশনাল ম্যানেজমেন্ট (নায়েম)’র সাবেক মহা পরিচালক  হামিদুল হক  বলেন, তাঁর কাছে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নিশ্চিন্তে হস্তান্তর করা যায় এবং যার নেতৃত্বে একটি শিক্ষার্থী বান্ধব ও আধুনিক প্রযুক্তি জ্ঞানসম্পন্ন নতুন প্রজন্মের শিক্ষক গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখতে পারে জাতি।’

সেই যে ক্লাস নেয়া শুরু করেছিলেন আর বন্ধ হয়নি। জীবনের নানা উত্থান-পতনের পথ বেয়ে আজ তিনি একজন খুরশীদুজ্জামান আহমেদ। বাবা করিম উদ্দিন আহমেদ ছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সহচর। মানুষের সেবা করেছেন একজন সফল সংসদ সদস্য হিসেবে। রাজনৈতীক পরিবারে বেড়ে উঠলেও আজীবন রাজনীতির বাইরে। তাঁর আচরণে কখনোই সম্ভ্রান্ত পরিবারের আভিজাত্য প্রকাশ পায়না। সংসার পেতেছেন নিজের স্কুলে। সকাল থেকে রাত অবধি পাওয়া যায় অফিসে। জীবন, সংসার আর চাকরি সবকিছু ছাপিয়ে চিন্তার কেন্দ্রবিন্দু করিম উদ্দিন পাবলিক পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়। ১৯৬৬ সালের ১২ অক্টোবর জন্ম নেয়া এই মানুষটি আজও যেন একুশ বছরের পূর্ন যুবক। যার নিজের যোগ্যতা ছিলনা, হারিয়ে গিয়েছিলেন সময়ের অন্ধকার ¯্রােতে সেই মানুষটি আজ অনুপ্রেরণার গল্প। প্রত্যন্ত গ্রামের একটি স্কুলের দেশ-বিদেশে পরিচিতি সাবালক করেছে তাঁর লালিত স্বপ্নকে। চোখের দিকে তাঁকালে মনে হয় ওখানে জল নেই শুধু বিশ^াসের আলো। গহীন অন্ধকারে আলোর রেখার মত মনে হয় তাঁর দৃপ্ত পথচলা। তিনি স্বপ্নের ফেরিওয়ালা। সবকিছু ছাপিয়ে একজন ভালো মানুষ।

1 Comment

Shahzaman ShuvohDecember 16, 2019 at 2:33 pm

খুব বেশিই সুন্দর এবং গর্ব করার মত এক ঐতিহাসিক শিক্ষকের গল্প