একটি সন্তানের জন্মের মুহুর্ত থেকে, নির্দিষ্ট শক্তিগুলি তার বিকাশে প্রভাবিত করছে। তাঁর উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত ক্ষমতা এবং প্রবণতাগুলি যেমন তার পরিবেশ এবং তার ইচ্ছার সাথে যোগাযোগ করে, তখন তিনি তার যৌবনের বৈশিষ্ট্যগুলি গ্রহণ করেন। মানুষের বৃদ্ধি অবশ্য শারীরিক পরিপক্কতার সাথে শেষ হয় না। ব্যক্তিত্বের কিছু অনুষদ বৃদ্ধ বয়সে প্রসারিত এবং পরিমার্জন করতে সক্ষম। শিশু বা প্রাপ্তবয়স্ক যাই হোক না কেন, শিক্ষা হ’ল নির্দিষ্ট লক্ষ্যগুলির দিকে বিকাশের এই মোট চলমান প্রক্রিয়াটির পরিচালনা।

 

খ্রিস্টান শিক্ষা শব্দটি বাইবেলে পাওয়া যায় নি, বাইবেল সাধারণভাবে এবং বিশেষত বাচ্চাদের মানবতার নৈতিক ও আধ্যাত্মিক নির্দেশনার কথা বলেছে। এটি ঈশ্বর এবং তাঁর কাজ উভয়েরই জ্ঞানের উপর একটি উচ্চ মূল্য রাখে। এটি এই জ্ঞানের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক ফলের বর্ণনা দেয় এবং এর চূড়ান্ত উদ্দেশ্যকে সংজ্ঞায়িত করে।

খ্রিস্টান শিক্ষার উদ্দেশ্য যেহেতু ঈশ্বরের প্রতিচ্ছবিতে মুক্তিপ্রাপ্ত মানুষকে বিকাশ করা, তাই খ্রিস্টান শিক্ষাব্রতীগণকে অবশ্যই শিক্ষার্থীদের এই চিত্রটির মূল প্রতিশ্রুতি দেওয়া উচিত ঈশ্বর স্বয়ং শিক্ষার্থীরা তাঁর বাক্যে ও তাঁর রচনায় তাঁর নিজের প্রকাশ সম্পর্কে অধ্যয়ন করে ঈশ্বরকে জানতে পারে। এর মধ্যে ঈশ্বরের আরও সম্পূর্ণরূপে প্রকাশ তাঁর হ’ল শব্দ; এবং, তাই বাইবেল খ্রিস্টান স্কুল পাঠ্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দু। বাইবেল কেবল সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়, অন্যান্য বিষয়গুলি এবং তাদের যেভাবে শেখানো হচ্ছে সেগুলি নির্ধারণ করার নীতিগুলির উত্সও। বাইবেলের সত্যের উপস্থাপনা এইভাবে পাঠ্যক্রমের একক খণ্ড  বাইবেল অধ্যয়ন  এর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, তবে সমস্ত বিষয়ের শিক্ষার মধ্যেই এটি বিভক্ত। শিক্ষকের ধর্মগ্রন্থের জ্ঞান তার পদার্থের নির্বাচন এবং ব্যাখ্যা নিয়ন্ত্রণ করে এবং তার বিষয় সম্পর্কে তার সম্পূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি নির্ধারণ করে। শাস্ত্র পাঠ্যক্রমে এই সুবিধাপূর্ণ মর্যাদার অধিকারী কারণ তারা ঈশ্বরের জ্ঞান পৌঁছানোর প্রাথমিক মাধ্যম।

 

খ্রিস্টানেরা বিশ্বাস করে একজন মাত্র ঈশ্বর  স্বর্গ ও মর্ত্যের দৃশ্যমান ও অদৃশ্য সমস্ত কিছুর সৃষ্টিকর্তা। অর্থাৎ ঈশ্বর জগতের পিতা। পিতারূপী ঈশ্বর প্রতিটি মানুষকে সন্তানের মতো ভালোবাসেন এবং তার সাথে সম্পর্ক রাখতে চান। কিন্তু প্রতিটি মানুষ পাপ করার প্রবণতা নিয়ে জন্মগ্রহণ করে (যার উৎস প্রথম মানব আদমের আদিপাপ)। এই সব ছোট-বড় পাপের কারণে মানুষ ও জগতের পিতা ঈশ্বরের মাঝে দূরত্বের সৃষ্টি হয়। খ্রিস্টানেরা বিশ্বাস করে যে যিশুখ্রিস্ট ঈশ্বরেরই দ্বিতীয় একটি রূপ; তিনি ঈশ্বরের একমাত্র প্রকৃত পুত্র। ঈশ্বরের তৃতীয় আরেকটি রূপ হল পবিত্র আত্মা। পবিত্র আত্মা বিভিন্ন নবী বা ধর্মপ্রচারকদের মাধ্যমে মানবজাতির সাথে যোগাযোগ করেছে। পবিত্র আত্মারূপী ঈশ্বর মানব কুমারী মেরির গর্ভে পুত্ররূপী ঈশ্বর তথা যিশুখ্রিস্টের জন্ম দেন, যার সুবাদে যিশুখ্রিস্ট রক্তমাংসের মানুষের রূপ ধারণ করে স্বর্গ থেকে পৃথিবীতে নেমে আসেন। পবিত্র আত্মারূপী ঈশ্বরের সুবাদে পুত্ররূপী ঈশ্বর যিশুখ্রিস্ট পৃথিবীতে বহু অলৌকিক কাজ সম্পাদন করেন। শেষ পর্যন্ত যিশু ক্রুশবিদ্ধ হয়ে যন্ত্রণাভোগ করে মৃত্যুবরণ করে সমগ্র মানবজাতির পাপের প্রায়শ্চিত্ত করেন।  কিন্তু তিন দিন পরে তিনি মৃত্যুকে পরাজিত করে পুনরুজ্জীবিত হন এবং স্বর্গে আরোহণ করেন যেখানে তিনি পিতারূপী ঈশ্বরের ডান পাশের আসনে অধিষ্ঠিত হন। ঈশ্বর উপহার হিসেবে সবাইকে ক্ষমা করে দিতে পারেন। সময়ের যখন সমাপ্তি হবে, তখন যিশু আবার পৃথিবীতে ফেরত আসবেন এবং শেষ বিচারে সমস্ত মানবজাতির (মৃত বা জীবিত) বিচার করবেন। যারা যিশুখ্রিস্টে বিশ্বাস আনবে এবং ঈশ্বরের ক্ষমা গ্রহণ করবে, তারাই ভবিষ্যতে শেষ বিচারের দিনে পরিত্রাণ পাবে ও স্বর্গে চিরজীবন লাভ করবে। পুরাতন নিয়মের পুস্তকগুলিতে যে মসিহ বা ত্রাণকর্তার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, খ্রিস্টানরা বিশ্বাস করে যে যিশুই সেই ত্রাণকর্তা। তারা যিশুকে একজন নৈতিক শিক্ষক, অনুকরণীয় আদর্শ এবং প্রকৃত ঈশ্বরকে উদ্ঘাটনকারী ব্যক্তি হিসেবে গণ্য করে।

 

খ্রিস্টধর্মের অনুসারীরা একটি ধর্মীয় পুস্তকসমগ্র অনুসরণ করে, যার সামগ্রিক নাম বাইবেল। বাইবেলের পুস্তকগুলিকে দুইটি বড় অংশে ভাগ করা হয়েছে: পুরাতন নিয়ম ও নতুন নিয়ম। খ্রিস্টানেরা বাইবেলের পুরাতন ও নতুন নিয়মের সমস্ত পুস্তককে ঈশ্বরের পবিত্র বাণী হিসেবে গণ্য করেন। পুরাতন নিয়ম অংশটি হিব্রু বাইবেল (বা তানাখ) এবং অব্রাহামের পৌত্র যাকব তথা ইসরায়েলের বংশধরদের লেখা অনেকগুলি ধর্মীয় পুস্তক নিয়ে গঠিত। খ্রিস্টধর্মের সবচেয়ে জনপ্রিয় শাখা ক্যাথলিক শাখাতে অনুমোদিত পুস্তকতালিকা অনুযায়ী বাইবেলের পুরাতন নিয়ম অংশে ৪৬টি পুস্তক আছে। এই পুস্তকগুলি বহু শতাব্দী ধরে বিভিন্ন সময়ে খ্রিস্টপূর্ব ৮ম শতক থেকে খ্রিস্টপূর্ব ২য় শতক পর্যন্ত মূলত হিব্রু ভাষাতে রচিত হয়।

বাইবেলের দ্বিতীয় অংশটির নাম নতুন নিয়ম, যা ২৭টি পুস্তক নিয়ে গঠিত। এই পুস্তকমালাতে যিশুর জীবন, শিক্ষা ও খ্রিস্টীয় ১ম শতকে তাঁর অনুসারীদের কাহিনী লিপিবদ্ধ আছে। নতুন নিয়মের বিভিন্ন পুস্তক খ্রিস্টীয় ১ম শতকেই পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে সেসময়ে অতি প্রচলিত গ্রিক ভাষাতে রচিত হয়, পরে খ্রিস্টীয় ৪র্থ শতকে এসে ৩৯৭ খ্রিস্টাব্দে ক্যাথলিক মন্ডলীর ধর্মীয় নেতারা উত্তর আফ্রিকার কার্থেজ শহরে আয়োজিত একটি সম্মেলনে নতুন নিয়মের পুস্তকগুলির একটি সঠিক তালিকা অনুমোদন ও প্রণয়ন করেন। নতুন নিয়মের প্রথম চারটি পুস্তককে একত্রে সুসমাচার নামে ডাকা হয়; এগুলিতে যিশুর জীবন, তাঁর মৃত্যু এবং মৃত অবস্থা থেকে তাঁর পুনরুত্থানের কাহিনী বর্ণিত হয়েছে।

 

Comments are closed.