এই উপমহাদেশের প্রাচীনতম ধর্ম সনাতন ধর্ম। এই সনাতন ধর্মই হিন্ধু ধর্ম নামে পরিচিত। এই ধর্ম কোন ব্যক্তিবিশেষ কর্তৃক প্রচারিত হয়নি। প্রাচীন ঋষিদের নিকট হইতে পর্যায়ক্রমিক গুরু শিষ্য দ্বারা প্রচারিত হত এবং তা পরে লিপিবদ্ধ হত।

হিন্ধু ধর্মের বানীবদ্ধ গ্রন্থের নাম বেদ। বেদের মুল অর্থ হল ‘জ্ঞান’ বা ‘সঞ্চিত জ্ঞান ভান্ডার’। মানুষের শিক্ষার জন, কল্যানের জন্য বিশেষ বিধান রয়েছে বেদে। বেদের ভাষা মতে সত্য কথা বলার নামই পরম ধর্ম। গীতায় কর্মের মধ্য দিয়ে পরিপূর্ণতা লাভের এবং দিব্যজ্ঞানের আলোক দীপ্তি অর্জনের নির্দেশ আছে। মানুষ ক্রমাগত শিক্ষার মাধ্যমে মৃত্যুর হাত থেকে সত্ত্বার দিকে, অমৃতের দিকে এগিয়ে যায়, পূনরায় সত্যিকারের জীবন লাভের জন্য।

বেদ, উপনিষদ, ধর্মশাস্ত্র, পূরাণ প্রভৃতিতে বিদ্যা ও শিক্ষার স্থান অতি উর্দ্ধে। বেদের  ঋষিগণের উদ্দেশ্য ছিল ধর্মের মাধ্যমে মানুষ গড়া। সে মানুষ হবে- ধার্মিক, শিক্ষিত, বীর, আদর্শগ্রাহী, সমাজসেবা ও দেশপ্রেমী। এ উদ্দেশ্যেই ধর্ম, বিদ্যা ও শিক্ষা- এ তিনটির একসাথে অনুশীলনের ব্যবস্থা করেছিলেন।  এই অনুশীলনের ব্যাবস্থাপকই শিক্ষক। কাজেই শিক্ষক যদি সঠিক না থাকে তাহলে ধর্ম ও সমাজ ধ্বংসে পৌছাবে।

সনাতন ধর্মের ধর্মগ্রন্থের সংখ্যা অনেক। এ ধর্মগ্রন্থগুলো হলঃ-

১. বেদ,
২. উপবেদ,
৩. বেদান্ত,
৪. স্মৃতি সংহিতা,
৫. গীতা,
৬. পুরাণ,
৭. আগামশাস্ত্র,
৮. রামায়ণ ও মহাভারত,
৯. চন্ডী এবং
১০. ষড়দর্শন, উপনিষদ ইত্যাদি।

উক্ত ধর্মগ্রন্থসমূহ ও এগুলোর সময়কাল সম্পর্কে নিম্নে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হল।

১. বেদ: সনাতন ধর্মের বিভিন্ন গ্রন্থের মধ্যে বেদের স্থান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সংস্কৃত ‘বিদ’ ধাতু থেকে বেদ শব্দটি নিস্পন্ন। বিদ+ঘঙ বেদ। বেদ অর্থ জানা । বৈদিক যুগে ঋষিগণ বেদকে ভিত্তি করে কয়েকটি গ্রন্থ রচনা করেন। বেদের সংখ্যা চারটি। যথা- ১. ঋকবেদ, ২. সামবেদ, ৩. যজুবেদ ও ৪. অথর্ববেদ।

বেদের শিক্ষা: পৃথিবীতে যে সমস্ত ধর্মগ্রন্থ রয়েছে তার প্রত্যেকটিরই স্ব স্ব শিক্ষা রয়েছে। সনাতন ধর্মের বেদগ্রন্থের শিক্ষা একমাত্র কর্ম। যেহেতু কর্মই মানুষের একমাত্র ধর্ম এবং ধর্মের মাধ্যমেই মানুষ তার নিজের কর্তব্য অনুধাবন করতে পারে। এ জন্য সনাতন ধর্মে বলা হয়, মানুষ কর্মের মাধ্যমেই ঈশ্বর, স্বর্গ ও যাবতীয় কল্যাণ পেতে পারে এবং মুক্তির পথ অনুসন্ধান করতে পারে।

২. উপবেদ: মূল বেদ ছাড়াও চারটি উপবেদ আছে। যথা- ১. আয়ুর্বেদ, ২. ধনুর্বেদ, ৩. গন্ধর্বেদ এবং ৪. স্থাপত্যর্বেদ। আয়ুর্বেদ হল ভেষজ শাস্ত্র, ধনুর্বেদ হল অস্ত্রবিদ্যা, গন্ধর্বেদ হল সঙ্গীত বিদ্যা আর স্থাপত্যর্বেদ হল কৃষিবিদ্যা।

উপবেদের শিক্ষা: উপবেদ হিন্দু সনাতন ধর্মাবলম্বীদেরকে চিকিৎসা, সঙ্গীত, স্থাপত্য ও অস্ত্রবিদ্যার শিক্ষা দিয়ে থাকে।

৩. বেদান্ত: বেদের মূল ভাবকে হৃদয়ঙ্গম করার জন্য বেদের সাহায্যকারী ছয়খানা অবয়বগ্রন্থ অধ্যয়ন করা আবশ্যক। আর এই অবয়বগুলোকে বলা হয় বেদান্ত। এগুলো হল- ১. শিক্ষা, ২. কল্প, ৩. ব্যাকরণ, ৪. নিরুক্ত, ৫. ছন্দ এবং ৬. জ্যোতিষ।

বেদান্তের শিক্ষা: বেদান্ত যদিও বেদের ছয়খানা অবয়ব গ্রন্থ আর শিক্ষা, কল্প, ব্যাকরণ, নিরুক্ত, ছন্দ এবং জ্যোতিষ এর মূল বিষয় তথাপি এর নিজস্ব একটা শিক্ষা রয়েছে। আর সেটা হল মানুষকে কর্মের চেয়ে শিক্ষার প্রতি অনুগামী করে তোলে। যাতে করে মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধি বৃদ্ধি পেয়ে স্রষ্টাকে বেশি উপলব্ধি করতে পারে।
স্মৃতি সংহিতা: যা যা স্মৃত হয়েছে তাই স্মৃতি। স্মৃতি পদের অর্থ স্মরণ। কুড়িখানা স্মৃতি সংহিতার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল- ১. মনুস্মৃতি, ২. যজ্ঞবলক, ৩. পরাশ্বর স্মৃতি ইত্যাদি।

  1. গীতা: গীতা সনাতন সমাজে ধর্মগ্রন্থ হিসাবে বিশেষ পরিচিত। যেহেতু মহাভারতের ভিক্ষুপূর্বের প্রসিদ্ধ শ্রীমদ্ভগবৎ গীতা, তাই চতুস্তর বেদের সার উপনিষদ আর উপনিষদের সার গীতা।

গীতার শিক্ষা: সনাতন ধর্মের প্রতিটি গ্রন্থ বা শাস্ত্রে পৃথক পৃথক শিক্ষা রয়েছে। গীতার ঈশ্বর পরম তত্ত্ব, পরমাত্মা, পুরুষোত্তম ঈশ্বর সর্বভূতের সনাতন বীজ। তাই ঈশ্বর সত্তাতে সকলের সত্তা এবং তিনি নিস্তব হয়েও স্বগুণ। তাছাড়া গীতা আরো শিক্ষা প্রদান করে, ঈশ্বর লাভ করতে হলে যোগ, কর্ম, ভক্তি ও জ্ঞান -এ চারটি মার্গের অনুসরণ করা আবশ্যক।

  1. পুরাণ: যা পুরাতন তাই পুরাণ। দার্শনিক তত্ত্ব ও সাধনাতত্ত্ব নানাবিধ উপাত্থ্যানের মাধ্যমে পুরাণ প্রচার করেছে। এ কারণেই তার নাম পুরাণ। পুরাণের লক্ষণ পাঁচটি। যথা- স্বর্গ, প্রতিস্বর্গ, বংশ, মন্বন্তর ও বংশানুচরিত। আবার পুরাণকে দু’শ্রেণীতে ভাগ করা যেতে পারে। যথা- ক. মহাপুরাণ, খ. উপপুরাণ।

পুরাণের শিক্ষা: পুরাণগ্রন্থের মধ্যে গল্পকথা, রূপক, উপমা ও প্রতীকের আশ্রয় সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। এ জন্য মানুষের কাছে পুরাণ অধিকতর জনপ্রিয়।

  1. আগামশাস্ত্র: সনাতন সমাজের মধ্যে আগামশাস্ত্রের অনেক জনপ্রিয়তা রয়েছে। কারণ আগামশাস্ত্রে নানা দেবদেবীর পূজার পদ্ধতি ও নিয়ম-কানুন আলোচনা করা হয়েছে।
  2. রামায়ণ ও মহাভারত: সনাতন ধর্মের অন্যতম ধর্মগ্রন্থ হল রামায়ণ ও মহাভারত। বেদের শাশ্বত সনাতন ধর্মগুলো ঐতিহাসিক কাহিনীর মধ্য দিয়ে জনসমাজে প্রচার করা এ ধর্মগ্রন্থ দুটির মুখ্য উদ্দেশ্য।

রামায়ণ ও মহাভারতের শিক্ষা: রামায়ণ ও মহাভারতের ধর্ম, রাজধর্ম, গার্হস্থ্য ধর্ম, সামাজিক ও ব্যক্তিগত সকল দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। তাই অধিকাংশ সনাতন ধর্মানুরাগী এ গ্রন্থ দুটির শিক্ষা অনুযায়ী জবিনযাপন করে থাকে।

  1. চন্ডী: চন্ডী সনাতন ধর্মের একটি স্বতন্ত্র ধর্মগ্রন্থ এবং গীতার ন্যায় চন্ডীও সনাতন ধর্মাবলম্বীদের নিত্য পাঠ্যবিষয়। তবে অনেকের মতে, চন্ডী মূলত স্বতন্ত্র ধর্মগ্রন্থ হলেও পুরাণের অন্তর্ভুক্ত ছিল।
  2. ষড়দর্শন: সনাতন ধর্মে মোক্ষ অনুসরণের উদ্দেশ্যে ষড়দর্শনের ব্রহ্ম, জীবজগৎ ইত্যাদি তথ্যের ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। এই ষড়দর্শন মূলত সংখ্যা, যোগ, ন্যায়, বৈদিক সূত্রি, মীমাংসা, উত্তর মীমাংসার বেদান্ত দর্শন। অর্থাৎ এ ছয় দর্শন মিলেই ষড়দর্শন।
  3. উপনিষদ: উপনিষদ মূলত বেদেরই একটি অংশ। যে গ্রন্থ পাঠে ব্রহ্মবিদ্যা লাভ করা যায়, তাকে উপনিষদ বলে। উপনিষদ সংখ্যায় অনেক। বর্তমানে ১১২ খানা উপনিষদের নাম জানা গেছে। তন্মধ্যে ১. বৃহদারণ্যক, ২. শ্বেতাশ্বেতরো, ছন্দোগ্য, ৪. কেন এবং ৫. কব উল্লেখযোগ্য।

উপনিষদের শিক্ষা: উপনিষদ গ্রন্থের মৌলিক শিক্ষা হল মানুষকে স্রষ্টার চিন্তা-চেতনার দিকে আগ্রহী করে তোলা, যাতে মানুষ তার স্রষ্টাকে চিনতে পারে।

 

Comments are closed.