প্রাচীন ছাত্র সমাজ তপস্যা জ্ঞানে অধ্যয়নকে গ্রহণ করতো; একথা নিঃসন্দেহে সত্য। যদিও সকলের জীবনে সে তপস্যায় সিদ্ধি লাভ বা সেই তপস্যার ফল কখনো এক হতো না। দেখা যায় যতদিন শিক্ষা পর্ব সমাপ্ত না হতো; ততোদিন কোন শিক্ষার্থী গৃহাভিমুখি হতো না। তাদের শিক্ষা জীবন একমাত্র গুরুপত্নী ও গুরুপরিবার ছাড়া দ্বিতীয় কোন লোকালয় বা গৃহী-পরিবেশের সাথে সংস্রব সম্ভব ছিল না। এই একটি মাত্র পরিবারের সহজ সান্নিধ্যও ছিল অতিশয় দুর্লভ। বহুর মাঝে মাত্র দু’এক জন গুরুর হৃদয় জয়কারী অতি মেধাবীর ভাগ্যেই ছিল সেই দুর্লভ সুযোগ। ফলে বিপরীত লিঙ্গের সম্পর্ক বর্জিত ব্রহ্মচর্য জীবন ছিল তাদের অনিবার্য। এতে করে শিক্ষার্থীদের চিত্ত বিনোদন বা অবকাশ যাপনও ছিল, কোন না কোন শিক্ষণীয় বিষয়-বৈচিত্রে নিমগ্ন। চব্বিশ ঘন্টা রুটিনের ছকে আবদ্ধ ছিল এই শিক্ষার্থী জীবন। অথচ তেমন জীবনও কখনো দেহ-মনের এক ঘেয়েমি নামক বন্দীত্বের অভিশাপে আক্রান্ত হতো না। দেখা যেতো শিক্ষার বৈচিত্রময়ীতার কারণে, জ্ঞানময় রুচি পরিবর্তনের মাঝে মঙ্গলময় প্রদীপ্ত জীবনেই ভাস্বর হয়ে উঠতো প্রতিটি শিক্ষার্থী। এমন শিক্ষা জীবনকে তাপসের তপস্যার চেয়েও উত্তম এবং শ্রেষ্ঠ বলা শ্রেয়। কারণ, তাপস তপস্যা করেন কোন একটি মাত্র বিষয়কে অবলম্বন করে। অপরদিকে একজন ছাত্রকে শিক্ষা গ্রহণ করতে হয় জাগতিক ব্যবহারিক জীবনের বহুমুখী প্রয়োজনের দিকে লক্ষ্য রেখে, নানা বিষয়ে।

প্রাচীন, এমনকি মধ্যযুগীয় শিক্ষা পর্বে, সেই ঊনবিংশ শতাব্দীর একেবারে শেষ প্রান্ত পর্যন্ত এই উপমহাদেশের শিক্ষায় সেই পাঠশালা পদ্ধতি বিদ্যমান ছিল। তখনো পর্যন্ত আধুনিক পাশ্চাত্যের ‘ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য’ নামক ব্যক্তি কেন্দ্রিক অহংবাদ, এদেশে অভিশাপ রূপে আবির্ভূত হয়নি। তাই শিক্ষা জগতে শিক্ষকের শিক্ষকতা ছিল নেশাধর্মী; জীবন জীবিকার তাগিদে নিছক পেশা সর্বস্ব নহে। এতে করে ভারতীয় সভ্যতার সুমহান ঐতিহ্যবাহী আদর্শ ‘আচারিয়ো পিতরো বিয় মেতং’ গুরু শিষ্যের নিকট পিতা তুল্য, এই কথাটির তাৎপর্য তখনো মস্নান হয়ে যায়নি। তাই শিক্ষক ছাত্রকে সন্তান জ্ঞানে স্নেহ ও শাসনের নিগড়ে আবদ্ধ করতে পারতেন অতি সহজেই। এমন আপত্য মধুর বন্ধনে আবদ্ধ ছাত্রের উপায় কোথা, শিক্ষা গুরুকে পিতার ন্যায় শ্রদ্ধা ও ভীতির বশে মান্য না করে? ছাত্র-শিক্ষকের মধ্যে এমন আন্তরিক সম্পর্কের পরিবেশ শিক্ষা জগতে বিদ্যমান থাকার কারণেই সেকালের গুরু গৃহবাসী ছাত্র কিশোরে শিক্ষা করতে গিয়ে, ভরা যৌবনে গুরুর আশীর্বাদ ধন্য একজন পরিপূর্ণ মানুষ হয়েই ফিরে আসতেন মাতা-পিতার কোলে, আলোয় আলোয় ভরে তুলতে। আর সেই ছাত্র আমরণ কাল আপন হৃদয় বেদীতে, জ্ঞানদাতা সেই শিক্ষাগুরুকে পূজা করতেন দেবজ্ঞানে, সূর্য জ্ঞানে। শিক্ষা গুরুও দূর হতে বিদ্যা-দানের সার্থকতায় পরম তৃপ্তি লাভ করতেন শিষ্যের অধীত বিদ্যা তার ব্যবহারিক জীবনে শুক্ল পক্ষের চন্দ্রের মতো দিন দিন বিকশিত হতে দেখে।

বৌদ্ধধর্মানুসারে শিক্ষক হলো পিতার মত। শিক্ষার এই প্রভাব  একইভাবে মাতা-পিতা, নিকট জ্ঞাতী ও নিকট প্রতিবেশীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাও অনস্বীকার্য। কারণ শিশুদের শৈশব ও কৈশোরে সহজাত প্রাথমিক বিদ্যালয় হলো পরিবার ও প্রতিবেশী। বিশেষ করে আদর্শ ও সচেতন মাতা-পিতার সজাগ অনুশাসন অর্থাৎ সন্তান গড়ার কৌশলে দক্ষ ও পারদর্শী হওয়াকে এক্ষেত্রে সার্থক মাতৃত্ব-পিতৃত্ব বলে। যে সকল মাতা-পিতা সন্তান গড়ার মনস্তাত্ত্বিক প্রয়োগ বিধিতে পারদর্শী, তাঁদের সন্তান কখনো মাতা-পিতার আশানুরূপ না হয়ে পারে না। তাই সন্তানের জনক-জননী হওয়ার আগে উপরোক্ত দক্ষতা অর্জনে সংসারগামী প্রত্যেক নারী-পুরুষকে অবশ্যই স্বতঃস্ফূর্ত, স্বশিক্ষিত অথবা প্রতিষ্ঠান ভিত্তিক শিশু মানোবিজ্ঞানের উপর প্রশিক্ষণ গ্রহণ একান্ত কর্তব্য। এই প্রশিক্ষণ গ্রহণে মাতা-পিতাকে উৎসাহিত করতে হলে তাদের সামনে কৃতি সন্তানের মাতা-পিতাকে আচার্য গুরুদেবের ন্যায় সামাজিকভাবে সম্মানিত করতে হবে বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে। তাঁদের সন্তানের জন্যে, যে ত্যাগ তিতিক্ষা তাঁরা বরণ করেছেন; মুক্ত মনে সকলকে তার প্রশংসা করতে হবে-
১. সন্তানকে ধার্মিক রূপে গড়ে তোলার জন্যে প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যায় বিহারে নিয়ে গিয়ে পুষ্প, প্রদীপ, সুগন্ধ দ্রব্যাদি দিয়ে বুদ্ধ পূজা, বন্দনা, শীলগ্রহণ ও ভিক্ষুদের খাদ্য ভোজ্যাদি দান দেয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে; ২. সপ্তাহের ছুটির দিনে ধর্মীয় আচার ব্যবহারাদি শিক্ষা গ্রহণে শিশুকে অভ্যস্ত করে তুলতে হবে। ৩. মাতা-পিতারা শিশু বা সন্তানদের সামনে মিথ্যা, কর্কশ বাক্য, সমপ্রলাপ বাক্য না বলে; চুরি না করে, ব্যাভিচারী না করে; হিংসা, ক্রোধ দ্বন্দ্ব, কলহ, প্রাণী হত্যা না করে; নেশা জাতীয় যাবতীয় দ্রব্য বর্জন করে; সর্বদা সংযমী, মিতব্যয়ী, প্রিয় মধুর ভাষী হয়ে; সন্তানদেরকেও সেভাবে সংযমতায় অভ্যস্ত করে তুলতে হবে; ৪. নিজেরা ভোরে ৪টায় ঘুম থেকে উঠে, ধ্যান বন্দনায় যেমন তৎপর হতে হবে; তেমনি সন্তানদেরও জাগ্রত করায়ে ধ্যান-বন্দনার পর অধ্যয়নে নিয়োজিত করতে হবে। ৫. রাত ১০টার পরে কেহই জেগে না থেকে, সকলে একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়ার অভ্যাস গঠন করতে হবে; ৬. ভোরে খালি পেটে এক লিটারের অধিক জল পানের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে; ৭. ভোরে কিছুক্ষণ যোগব্যায়ামের অভ্যাস করতে হবে; ৮. নির্দিষ্ট স্থানে পায়খানা-প্রস্রাব, কফ, থুথু ফেলার অভ্যাস করতে হবে; ৯. পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন বস্ত্র ব্যবহারের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে; ১০. পরিষ্কার, নির্দোষ লঘু পাচ্য খাদ্য গ্রহণ, বাজারে, পথের ধারে, স্কুলে, যখন তখন খাদ্য গ্রহণ হতে বিরত রাখার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে, এবং ১১. পারিবারিক কাজে দায়িত্ব জ্ঞান, নিয়মিত দৈনিক রুটিন মেনে চলার অভ্যাস, সন্তানদের জীবনে শৈশব হতে গড়ে তোলা। এ সকলই হলো সার্থক মাতা-পিতার আদর্শ-ব্রত।

Comments are closed.