ছোটবেলায় কাজী কাদের নেওয়াজ এর শিক্ষকের মর্যাদা কবিতা পড়তাম, তখন ভাবতাম  আহা! যদি শিক্ষক হতাম! আমি নিজেও দেখতাম সমাজে শিক্ষকের মর্যদা অসীম। কয়েক বছর আগে তিতাস উপজেলার জগতপুর সাধনা উচ্চ বিদ্যালয়ে এস এস সি পরীক্ষায় নকলে বাঁধা দেয়া মজিদপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক জোবাইদা আক্তারকে পরীক্ষার হল থেকে বের হবার পরপরই কিছু নকলবাজ ছাত্র এবং অভিভাবক হামলা করে। এই ঘটনার পরপরিই কাজী কাদের নেওয়াজ এর শিক্ষকের মর্যাদা কবিতাটি বেশি মনে পড়েছে এবং এই কবিতাটিকে অলীক মনে হয়েছে।

 

শিক্ষকের মর্যাদা
– কাজী কাদের নেওয়াজ
=====================
বাদশাহ আলমগীর-
কুমারে তাঁহার পড়াইত এক মৌলভী দিল্লীর।
একদা প্রভাতে গিয়া
দেখেন বাদশাহ- শাহজাদা এক পাত্র হস্তে নিয়া
ঢালিতেছে বারি গুরুর চরণে
পুলকিত হৃদে আনত-নয়নে,
শিক্ষক শুধু নিজ হাত দিয়া নিজেরি পায়ের ধুলি
ধুয়ে মুছে সব করিছেন সাফ্ সঞ্চারি অঙ্গুলি।
শিক্ষক মৌলভী
ভাবিলেন আজি নিস্তার নাহি, যায় বুঝি তার সবি।
দিল্লীপতির পুত্রের করে
লইয়াছে পানি চরণের পরে,
স্পর্ধার কাজ হেন অপরাধ কে করেছে কোন্ কালে!
ভাবিতে ভাবিতে চিন্তার রেখা দেখা দিল তার ভালে।
হঠাৎ কি ভাবি উঠি
কহিলেন, আমি ভয় করি না’ক, যায় যাবে শির টুটি,
শিক্ষক আমি শ্রেষ্ঠ সবার
দিল্লীর পতি সে তো কোন্ ছার,
ভয় করি না’ক, ধারি না’ক ধার, মনে আছে মোর বল,
বাদশাহ্ শুধালে শাস্ত্রের কথা শুনাব অনর্গল।
যায় যাবে প্রাণ তাহে,
প্রাণের চেয়েও মান বড়, আমি বোঝাব শাহানশাহে।

তার পরদিন প্রাতে
বাদশাহর দূত শিক্ষকে ডেকে নিয়ে গেল কেল্লাতে।
খাস কামরাতে যবে
শিক্ষকে ডাকি বাদশা কহেন, ”শুনুন জনাব তবে,
পুত্র আমার আপনার কাছে সৌজন্য কি কিছু শিখিয়াছে?
বরং শিখেছে বেয়াদবি আর গুরুজনে অবহেলা,
নহিলে সেদিন দেখিলাম যাহা স্বয়ং সকাল বেলা”
শিক্ষক কন-”জাহপানা, আমি বুঝিতে পারিনি হায়,
কি কথা বলিতে আজিকে আমায় ডেকেছেন নিরালায়?”
বাদশাহ্ কহেন, ”সেদিন প্রভাতে দেখিলাম আমি দাঁড়ায়ে তফাতে
নিজ হাতে যবে চরণ আপনি করেন প্রক্ষালন,
পুত্র আমার জল ঢালি শুধু ভিজাইছে ও চরণ।
নিজ হাতখানি আপনার পায়ে বুলাইয়া সযতনে
ধুয়ে দিল না’ক কেন সে চরণ, স্মরি ব্যথা পাই মনে।”

উচ্ছ্বাস ভরে শিক্ষকে আজি দাঁড়ায়ে সগৌরবে
কুর্ণিশ করি বাদশাহে তবে কহেন উচ্চরবে-
”আজ হতে চির-উন্নত হল শিক্ষাগুরুর শির,
সত্যই তুমি মহান উদার বাদশাহ্ আলমগীর।”

 

 

এরপর কবিটি আবার মনে পড়ল ২০১৯ সালে মে মাসে। ১২ মে ২০১৯  রবিবার  দুপুর দুইটায় উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার ব্যবহারিক পরীক্ষা শেষে মোটরসাইকেল যোগে বাড়ি ফিরছিলেন সরকারি শহীদ বুলবুল কলেজের বাংলা বিভাগের প্রভাষক মাসুদুর রহমান। কলেজের মূল ফটকে কিছু বুঝে ওঠার আগেই অতর্কিতে হামলা করে মাসুদুরকে পেটাতে শুরু করে ছাত্রলীগ ক্যাডাররা। ছবিতে কলেজ সভাপতি শামসুদ্দীন জুন্নুনকে হামলাকারীদের নিবৃত্ত করতে দেখা গেলেও ওই শিক্ষকের অভিযোগ কলেজ ছাত্রলীগ সভাপতি জুন্নুনের নির্দেশেই এই হামলা হয়েছে।

সরকারী শহীদ বুলবুল কলেজের বাংলা বিভাগের প্রভাষক মাসুদুর রহমান বলেন, ঘটনার পর থানায় অভিযোগ তো দূরের কথা নিরপত্তাহীনতায় তিন দিন ধরে ঘর থেকেই বের হচ্ছেন না তিনি।

 

ব্রিটেন-ভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব ইকোনোমিক এবং সোশ্যাল রিসার্চ ৩৫টি দেশে ৩৫,০০০ মানুষের ওপর এক গবেষণা চালিয়ে যে “শিক্ষক মর্যাদা সূচক” প্রকাশ করেছে, তাতে এই চিত্র বেরিয়ে এসেছে। ব্রিটেনে শিক্ষকের মর্যাদা সূচকের মাঝমাঝি জায়গায়। যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স এবং জার্মানির চেয়ে ওপরে। যে কয়টি দেশের ওপর জরিপ করা হয়েছে তাতে বাংলাদেশ ছিলো না।

 

শিক্ষক হিসাবে ক্লাসরুমে সম্মান এবং মর্যাদা চীন, মালয়েশিয়া বা তাইওয়ানে বেশি। আন্তর্জাতিক এক সমীক্ষা বলছে, এই তিনটি দেশে শিক্ষকদের সর্বাধিক মর্যাদা দেওয়া হয়। শিক্ষক হিসাবে মর্যাদা পাওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে কম যে সব দেশে তার মধ্যে রয়েছে ব্রাজিল, ইসরায়েল এবং ইটালি।

চীন তালিকার সবচেয়ে ওপরে। চীনের ৮১ শতাংশ শিক্ষার্থী বিশ্বাস করে শিক্ষকদের সম্মান করতে হবে, যেখানে আন্তর্জাতিকভাবে এই গড় ৩৫ শতাংশ।

সম্মান করার সংস্কৃতি

ইউরোপ এবং দক্ষিণ আমেরিকায় শিক্ষকদের সম্মান দেওয়ার ইস্যু ততটা গুরুত্ব পায়না যতটা পায় এশিয়ায়। বিশেষ করে চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান বা মালয়েশিয়ায় শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদা অনেক ওপরে। এবং আন্তর্জাতিকভাবে যে সব প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা হয়, সেখানে এই দেশের ছাত্র-ছাত্রীরাই সবচেয়ে ভালো করছে। তার অন্যতম কারণ হচ্ছে, মর্যাদা রয়েছে বলে ভালো শিক্ষক পাওয়া এবং ধরে রাখাও সহজ হয় এসব দেশ। গবেষণায় দেখা গেছে, চীন, ভারত বা গানায় এখনও পরিবারগুলো তাদের সন্তানদের শিক্ষক হতে উৎসাহিত করে। অন্যদিকে ইসরায়েল বা ব্রিটেনে বাবা-মায়েরা চাননা তাদের সন্তানরা শিক্ষকতায় ঢুকুক।

ভার্কি ফাউন্ডেশন নামে যে দাতব্য প্রতিষ্ঠানটি এই গবেষণায় পয়সা জুগিয়েছে, সেটির প্রতিষ্ঠাতা সানি ভার্কি বলেন, “এই গবেষণায় একটি প্রচলিত বিশ্বাস প্রমাণিত হলো যে যেসব সমাজে শিক্ষকের মর্যাদা বেশি, সেখানে শিক্ষার্থীরা ভালো শিক্ষা পায়।”

“কোনো সন্দেহ ছাড়াই আমরা এখন বলতে পারি, শিক্ষককে মর্যাদা করা কোনো নৈতিক দায়িত্ব নয়, এটা কোনো দেশের শিক্ষার মানের জন্য জরুরী।”

বিবিসি খবের জানা যায় শিক্ষকরা সবেচেয়ে বেশি মর্যাদা পান এমন শীর্ষ ১০টি দেশ হলোঃ ১. চীন ২. মালয়েশিয়া ৩. তাইওয়ান ৪. রাশিয়া ৫. ইন্দোনেশিয়া ৫. দক্ষিণ কোরিয়া

৭. তুরস্ক. ৮. ভারত. ৯. নিউজিল্যান্ড ১০. সিঙ্গাপুর

তথ্যসূত্রঃ অনলাইন

Comments are closed.